রিফাত আরেফিন : বিদায়ী বছরে নওয়াপাড়ার আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউদ্দিন পলাশসহ আরো কয়েক জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিশুসহ যশোর জেলার ৮ উপজেলায় শতাধিক হত্যাকান্ডের মধ্যে ৫০টি হত্যাকান্ডের তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। অগ্রগতি হওয়া মামলা গুলোর বেশিরভাগই যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি ও পিবিআই যশোর রহস্য উন্মোচনসহ হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত ও অপরাধী আটক করেছে।
তদন্তে পিছিয়ে রয়েছে ৫০টির মত হত্যাকান্ডর ঘটনা। এরমধ্যে ৫ আগস্ট হোটেল জাবেরে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে পুড়ে ছাত্র জনতা মিলে ২৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা। এর মধ্যে চাঞ্চল্যকর ২০ হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল উঠতি দুর্বৃত্তরা। তুচ্ছ ঘটনায় এবং স্থানীয় আধিপত্য দ্বন্দ্বে হত্যাকান্ডগুলো ঘটেছে।
বিশেষ করে যশোর সদর উপজেলায় চিহ্নিত প্রতিপক্ষ ও পরিচিত জনদের হাতে খুনগুলো হয়েছে। এলাকাভিত্তিক দলীয় সেল্টারে থাকা উঠতি সন্ত্রাসীরা লোমহর্ষক ঘটনাগুলো ঘটিয়ে চলেছে। দলীয় মিছিল মিটিংয়ে দেখা মেলা উঠতি দুর্বৃত্ত চক্র ক্রাইম ঘটিয়ে সহজেই পালিয়ে গেছে। যদিও পুলিশ বলছে তদন্তে পিছিয়ে থাকা হত্যাকান্ডগুলোর বেশিরভাগই ক্লুলেস। দ্রুততম সময়েই মামলাগুলো তদন্তে অগ্রতি হবে।
মাত্র ৩ দিন আগে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর রাত ১০ টার দিকে নওয়াপাড়া পৌর শহরের আয়কর অফিসের পেছনে পরিত্যক্ত একটি ঘরে আটকে দুর্বৃত্তরা উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করে নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন পলাশকে। এলাকার একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী চক্র পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে। বছরের শেষ দিকে এই ভয়ংকর হত্যাকান্ডের ঘটনায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিদায়ী বছরের ১৭ জানুয়ারি রাতে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে আরবপুর এলাকায় দুর্বৃত্তরা যশোরের উপশহর আলিম মাদরাসার শিক্ষক আব্দুল মালেককে কুপিয়ে হত্যা করে। গত ১৯ জানুয়ারি রাত ১০ টার দিকে যশোরের শহরতলী ছোট শেখহাটিতে রিপন হোসেন দিপু নামে এক মাংস ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি পরকীয়ার বলি হন ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের শাহাদাত হোসেনের ছেলে তৌফিক হোসেন। ২৫ জানুয়ারি যশোর শহরের টিবি ক্লিনিক মোড়ে সোলায়মান হোসেনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে যশোর উপশহর এলাকায় মায়া রানী নামে এক গৃহবধূকে হত্যার পর স্বামী পরিতোষ কুমার সানাকে আটক করে পুলিশ। ৮ ফেব্রুয়ারি যশোরের ফতেপুর ইউনিয়নের মান্দিয়া গ্রাম থেকে নুরপুর গ্রামের মহিউদ্দিন মহির ছেলে মহাসিন আলীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি যশোর স্টেশন এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন চিহ্নিত সন্ত্রাসী জুম্মান। ১০ ফেব্রুয়ারি যশোর শহরের পশ্চিম বারান্দী মেঠোপাড়ায় রিকসা চালক টগরকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১১ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার রাজারহাট-রামনগরের সতীঘাটা এলাকায় জালাল উদ্দিন গাজীর ছেলে ফয়জুল গাজী খুন হন।
১১ ফেব্রুয়ারি নওয়াপাড়া বেঙ্গল জুট মিল গেট এলাকায় যুবলীগ নেতা মুরাদ হোসেনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহত মুরাদ হোসেন নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও একই এলাকার সাহাবুদ্দিনের ছেলে। গত ভাষা দিবসের দিন জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে সদর উপজেলার মালিডাঙ্গা গ্রামে নাইমুর রহমান হিমেল নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়ামনকাটি এলাকায় প্রতিপক্ষের মারপিটে নিহত হন চয়ন দাস নামে আরো এক যুকক।
এর আগে গেল বছরের ৩ জানুয়ারি রাতে পুরাতন কসবা থেকে শাহ আলম নামে এক ব্যক্তিরকে হত্যা করা হয়। ৯ জানুয়ারি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) গাড়ি চালক খলিলুর রহমানকে হত্যা করা হয়। ১৩ জানুয়ারি সকালে যশোর শহরের খড়কি ধোপাপাড়ায় মারিয়াম নামে দুই বছর বয়সের এক শিশুকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যা করে তার সৎ মা পারভীন খাতুন। ১৪ জানুয়ারি লাল দীঘিরপাড়ে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শংকরপুর এলাকার ছোটনের মোড়ের মাহাতাব মোল্লার ছেলে তুষার মোল্লাকে।
গত ১০ অক্টোবর বেনাপোলের ছোট আঁচড়া গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করা হয় ওয়াহিদুল ইসলামকে। ১১ অক্টোবর সদর উপজেলার গোয়ালদহ গ্রামের তালাক দেয়া স্ত্রী দিবা খাতুনকে কুপিয়ে হত্যা করে সাবেক স্বামী সালাউদ্দিন গাজী। পরে তিনিও দলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৪ অক্টোবর যশোর শহরের বকচর এলাকায় রানী চানাচুর ফ্যাক্টরিতে মণিরামপুরের ঝালঝাড়া খালকান্দা গ্রামের আসমত আলীর ছেলে মিলন মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৩০ অক্টোবর রাতে যশোরের শহরতলী শেখহাটি আদর্শপাড়ায় গৃহবধূ শাহানারা বেগম সানাকে কুপিয়ে হত্যা করে বাড়ির দুই নেশাখোর ভাড়াটিয়া।
৩০ অক্টোবরে শার্শার গোগা ইউনিয়নের আমলাই গ্রামে তাসলিমা খাতুন নামে নারীকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। ৩১ অক্টোবর অভয়নগরে কবুতর চুরিকে কেন্দ্র করে গহর উদ্দিন নামে এক বয়াতি খুন হন।
এর আগে ১ নভেম্বর রাতে যশোর শহরের খড়কি দক্ষিণপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে আসাদুল ইসলাম আসাদ নামে এক ব্যক্তি খুন হন। ৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ৭টার দিকে দোকান করে মসজিদে যাওয়ার পথে আমিনুল ইসলাম সজল নামে জামায়াতের এক নেতা খুন হন। ৪ নভেম্বর সকালে যশোর সদর উপজেলার ছোট হৈবতপুরে তোজাম্মেল হক লিটনের মেয়ে তাসফিয়া হক রিফাকে (পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী) হত্যা করা হয় বলে আদালতে মামলা হয়। ১৫ নভেম্বর রাতে ত্রিভুজ প্রেমের কারণে খুন হন বাসের হেলপার বাপ্পি। ১৬ নভেম্বর অভয়নগরের বুইকারা গ্রামের পশ্চিমপাড়ার রবিউল ইসলামকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ২১ ডিসেম্বর বেনাপোল ও চৌগাছা সীমান্ত এলাকায় বেনাপোলের কাগজপুকুর গ্রামের আরিফুল ইসলামের ছেলে সাবু হোসেন, ইউনুস আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও চৌগাছার শাহজাদপুর গ্রামের জামিলের ছেলে সাকিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়।
২৪ ডিসেম্বর যশোরের বাঘারপাড়ার জামদিয়ার সিটি ব্রিক্স-১ এর পাশের চায়ের দোকানের সামনে খুলনা পাইকগাছার বাড়ইডাঙ্গা গ্রামের সোহরাবের ছেলে আল আমিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৯ জুলাই যশোর শহরের রেলগেট এলাকার মডেল মসজিদের সামনে থেকে ঝিকরগাছা উপজেলার পায়রাভা গ্রামের বাসিন্দা আকিকুল ইসলাম ওরফে আর্কি নামে এক ফল ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। ১৩ জুলাই বিবাহবার্ষিকী পালন করা নিয়ে বিরোধে যশোর শহরের চুড়িপট্টিতে প্রিয়ন্তী নামে এক নববধূকে হত্যা করে তার স্বামী নয়ন কুমার দে। ১৯ জুলাই যশোর ওয়াপদাপাড়া বনবিথী লেনে ভাড়ার বাসায় খুন হন কলেজ ছাত্রী মৌমিতা রানী।
এভাবে জেলার ৮ উপজেলায় খুন হয়েছেন ৮০ জনের মত। এছাড়া ১০ জনের বেলায় হত্যাকান্ডের অভিযোগ উঠেছে। আর ৮০ হত্যাকান্ডের মধ্যে ৫০টি হত্যাকান্ডের আসামি শনাক্ত ও আটক হয়েছে। অনেক হত্যা মামলার আসামি জেল হাজতে রয়েছেন। অনেক আসামি জামিন পেয়ে বাইরেও রয়েছেন। আবার তদন্তে অগ্রগতি হয়নি ৫০টির মত ঘটনার। এর মধ্যে হত্যাকান্ডের অভিযাগে ৩টি লাশ উত্তোলন করা হয়েছে। আদালতে হত্যার অভিযোগ তুলে মামলা হয়েছে ১০টি ঘটনার। সব মিলিয়ে ৫০টি ঘটনার অগ্রগতি হয়নি।
তবে যে ৫০টি ঘটনার অগ্রগতি হয়েছে তার অধিকাংশ হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচনসহ আসামি আটক করা হয়েছে। এতে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি ও পিবিআই যশোর এগিয়ে আছে।
এ ব্যাপারে পিবিআই যশোরের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানিয়েছেন, অপরাধ প্রতিরোধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে পিবিআই, যশোর। ক্লুলেস হত্যাকান্ড তদন্তে অনেক সাফল্য এসেছে। দায়িত্ব পাওয়া অধিকাংশ হত্যাকান্ডে জড়িতদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়া ঘটে যাওয়া হত্যাকান্ডগুলোর ব্যাপারে দ্রুততম সময়ে অ্যাকশানে গিয়ে রহস্য উন্মোচনসহ জড়িতদের শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে।
যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, কোতোয়ালিতে হওয়া হত্যাকান্ডগুলো যত্নসহকারে তদন্ত হয়েছে। অনেকেই আটক হয়েছে। আবার অনেক আসামি পালিয়েও বেড়াচ্ছে। তাদের আটকে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে অধিকাংশ মামলার একটা ভাল তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া ক্লুলেস কয়েকটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত আটকের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশের অভিযানিক টিম।




















