জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ: সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ নামে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আবারও প্রমাণ করেছেন, সরকারি দায়িত্বের সীমানা ছাড়াই মানুষের পাশে দাঁড়ানোই একজন সত্যিকারের প্রশাসকের কর্তব্য। গত শুক্রবার (৪ অক্টোবর) একটি হৃদয়বিদারক ঘটনায় তার এই মানবিক উদ্যোগ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
রাজবাড়ী জেলার কালুখালি উপজেলার মাঝপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রিংকু শরীফের মেয়ে পিংকি শরীফ (২৫) শুক্রবার সকাল ৮টায় ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পাশে অবস্থিত বেসরকারি বিএনকে হাসপাতালে মারা যান। তার নবজাতক কন্যা তখনও মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পরও পরিবারের শান্তি মিলেনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকার বিল পরিশোধের দাবিতে লাশ আটকে রাখে। অসহায় পিতা রিংকু শরীফ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে মাত্র ৪০ হাজার টাকা সংগ্রহ করলেও হাসপাতাল তাতে রাজি হয়নি।
এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনির সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধানের অনুরোধ জানান। অতিরিক্ত সচিব দ্রুত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মঈনুল হাসানকে নির্দেশ দেন। ডা. হাসান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে পরিবারের আর্থিক অসমর্থতা জানিয়ে লাশ হস্তান্তরের অনুরোধ করেন।
ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে লাশ হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেয়। টানা ১৪ ঘণ্টা জিম্মি রাখার পর শুক্রবার রাত ১০টায় পিংকির মরদেহ এবং তার নবজাতক কন্যাকে (যে পরে মারা যান) পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরিবার মা-মেয়েকে একসাথে কালুখালির গ্রামের বাড়িতে দাফন করে।
অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি: “জাহিদুল ইসলামের অনুরোধে আমি ডা. মঈনুল হাসানকে ব্যবস্থা নিতে বলি। তিনি দক্ষতার সাথে বিষয়টি সমাধান করেন। জাহিদুল সত্যিই একজন ভালো ও মানবিক ডিসি। তার কর্মকাণ্ড প্রশংসনীয়।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মঈনুল হাসান: “অতিরিক্ত সচিবের নির্দেশে হাসপাতালের সাথে কথা বলে মানবিক কারণে লাশ হস্তান্তর করানো হয়। কৃতিত্ব প্রথমে নারায়ণগঞ্জের ডিসি সাহেবের।”
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা: “সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে অতিরিক্ত সচিবকে জানাই। তারা ব্যবস্থা নিয়ে মানবিকতার হাত প্রসারিত করেছেন। রাজবাড়ীর মানুষের অবস্থা আমি কাছ থেকে জানি। দায়িত্বের বাইরেও মানবিক কাজের আত্মিক প্রশান্তি কোটি টাকায়ও পাওয়া যায় না।”
পিংকির পিতা রিংকু শরীফ: “তাদের সাহায্য ছাড়া লাশ বের করতে পারতাম না। তারা চিনতেন না, তবু পাশে দাঁড়ালেন। আজীবন কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।”
পিংকির চাচা জিরু সর্দার জুয়েল: “তাদের সাহায্য না পেলে আমরা টাকা ছাড়া লাশ বের করতে পারতাম না। অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।”
পিংকিকে প্রথমে সাভার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, কিন্তু এক দালালচক্রের প্রলোভনে বিএনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরই জেলা প্রশাসকের দ্রুত পদক্ষেপে পরিবারের অসহায়ত্ব দূর হয়। এমন মানবিক উদ্যোগ সকল প্রশাসকের জন্য অনুকরণীয়।




















