রতন দে,মাদারীপুর প্রতিনিধি: মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী মহামানব শ্রীশ্রী গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের ঐতিহ্যবাহী কুম্ভ মেলায় ভক্ত সংঘের উদ্যোগে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প,ঔষুধ তিরণ,সুপেয় পানি,সরবত,বাতাসা,প্রসাদ বিতরণ ও ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় আগত ভক্তদের প্রশংসা কুড়িয়েছে ভক্ত সংঘ।
জানা যায়,হিন্দু ধর্মাম্বলীদের শাস্ত্রমতে সত্য যুগে দেবতা ও অসুরদের মধ্যে সমুদ্র মন্থনে যে অমৃত সুধা উঠেছিল তা চারটি কুম্ভ পাত্রে হরিদ্বার,প্রয়াগ,উজ্জয়িনী ও নাসিক এ চারটি স্থানে রাখা হয়েছিল। এ ঘটনার পর থেকে ভারতীয় মুনি ঋষিরা কুম্ভ মেলার আয়োজন করে আসছেন। প্রায় দেড় শত বছর পূর্বে জ্যৈষ্ঠ মাসের ১৩ তারিখ ১৩ জন সাধু ১৩ সের চাল ও ১৩ টাকা নিয়ে রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় ভারতের কুম্ভমেলাকে অনুসরণ করে এ মেলার আয়োজন করেন। সেই থেকে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় মহামানব শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এক রাতের মেলা হলেও এ মেলা চলে সপ্তাহ ব্যাপী। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক ভক্তবৃন্দের উপস্থিতি ঘটে এ কুম্ভমেলা বা কামনার মেলায়। বুধবার সকাল থেকেই দলে দলে জয় ডংকা ও নানা রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জয় হরিবল ও জয়বাবা গনেশ পাগল ধ্বণি করতে করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধু সন্যাসী ও ভক্তবৃন্দরা বাসে, ট্রাকে, ট্রলারে ও পদব্রজে মেলা প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন।
খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, বগুড়া, চিটাগং, রংপুর, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নারায়নগঞ্জ, গোপালগঞ্জ,গৌরনদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দলে দলে মানুষ আসে।এছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল,শ্রীলঙ্কা ও অন্যান্য রাষ্ট্র থেকেও বহু ভক্তবৃন্দ আসে ঐতিহ্যবাহী এ কামনার মেলায়।
এ মেলায় আসা হাজার হাজার সাধু সন্ন্যাসী ও আর ভক্তরা একতারা আর দোতারায় সুর দিয়ে সারা রাত মাতিয়ে তুলেন। আয়োজন করা হয় ছোট বড় অর্ধশতাধিক প্যান্ডেলে বাউল ও ধর্মীয় সঙ্গীতানুষ্ঠানের। গভীর রাত পর্যন্ত চলে অর্ধ লক্ষাধিক ভক্তদের মধ্যে কয়েকটি ভক্তসেবা কমিটির প্রসাদ বিতরন।
মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘের ঐতিহ্যবাহী কুম্ভমেলায় ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখার উদ্যোগে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
ক্যাম্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২৭মে মঙ্গলবার রাত থেকে। বুধবার সকাল থেকে হাজার হাজার আগত ভক্তদের মধ্যে সরবত, বিশুদ্ধ পানি, বাতাসা(মিষ্টি) ও প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
এছাড়াও অসুস্থ রোগীদের সেবায় ভক্ত সংঘের চারজন চিকিৎসক সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সার্বক্ষণিক বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও ঔষধ বিতরণ করেন। ২৭মে মঙ্গলবার রাতে সেবা ক্যাম্পের শুভ উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ভাগবত পাঠক গোপীনাথ দাস ব্রহ্মচারী। ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক নিত্যানন্দ হালদারের সভাপতিত্বে ও জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক উত্তম কুমার বাগচীর অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সেবা ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক তপন মল্লিক, সভাপতি শান্তি রঞ্জণ মন্ডল, সাধারন সম্পাদক যোগেশ মন্ডল, সিনিয়র সহ-সভাপতি রাম সরকার,সহ-সভাপতি বিকাশ কান্তি রায়, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক কিরন রায়, সাংগঠনিক সম্পাদক পলাশ মল্লিক, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক রিপন পাল, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক নিতাই সূত্রধর, উপদেষ্টা পল্টুরঞ্জন দোকানী,প্রচার সম্পাদক আকাশ মল্লিক, বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী রমা সমাদ্দার প্রমুখ।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে মহামানব গণেশ পাগল সেবাশ্রম সংঘে উপস্থিত লাখো ভক্তদের সেবায় ভক্ত সংঘ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি মাদারীপুর জেলা শাখা যে অবদান রেখেছে,এতে সেবা প্রার্থীরা খুবই খুশি হয়েছেন। একটি অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় সেবামুলক সংগঠন ভক্ত সংঘ আগামীতে আরো বেশি বেশি সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করবে এমনটাই প্রতাশা করেন বক্তারা।ভক্ত সংঘের শতাধিক সদস্য রাত দিন ২৪ ঘন্টা নিজেদেরকে সেবামুলক কাজে নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করেন। ভক্ত সংঘের শিল্পীরা সারারাত ধর্মীয় সংগীতের মধ্যে দিয়ে ভক্তদের মাতিয়ে তুলেন।
এ মেলা উপলক্ষে প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে সারি সারি নানা রকমের দোকান।পুরো মেলাটি সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এদিকে লাখ লাখ ভক্তদের উপস্থিতিতে মোবাইল নেটওয়ার্কে কাজ না করায় যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ফলে যোগাযোগ ব্যাবস্থা সুগম করতে একটি ভ্রাম্যমান টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে গ্রামীণ ফোন।দেশ বিদেশ থেকে আসা এসব সাধু সন্ন্যাসী ও ভক্তরা ১০৮টি মন্দির দর্শন, প্রার্থনা, আরাধনা, পূজা-অর্চণা, ধর্মীয়, সঙ্গীত, নৃত্য-বাদ্য বাজনা পরিবেশনের মধ্য দিয়ে রাত অতিবাহিত করেন।
এ মেলা উপলক্ষে ৭ দিন পুর্ব থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসে দোকানিরা।বাঁশ বেতের শিল্প কারু কাজ খচিত গৃহস্থালী মালামাল, মৃৎ শিল্প বা মাটির তৈরী তৈজসপত্র, বাহারী মিষ্টি, দৃষ্টি আকর্ষনীয় খেলনা ও বাহারী প্রসাধণী পণ্য দিয়ে সাজিয়ে বসছে কমপক্ষে ২ সহস্রাধিক বিভিন্ন ধরনের স্টল।তবে বেশী ভীড় জমে মিষ্টির দোকান ও হোটেলে।
মেলা কমিটির সভাপতি মিরন বিশ্বাস জানান,দুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কুম্ভমেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে মেলা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সভাপতি প্রশাসনসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান। সভাপতি বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর বেশি ভক্তের উপস্থিতি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ব্যবসায়ীদের কিছুটা ক্ষতিসাধিত হয়েছে।আনুষ্ঠানিকভাবে আজ ৩০মে মেলার সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়েছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা কেউ দুই এক দিন থাকতে চাইলে সেটা তাদের ব্যাপার।




















