গঙ্গাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি: রংপুরের গঙ্গাচড়ায় প্রাণীসম্পদ সেবা সপ্তাহ শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প-এলডিডিপি ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজন করা হয় দিনব্যাপী প্রাণী প্রদর্শনী মেলা।
এদিকে মেলা আয়োজকদের চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আমন্ত্রিত অতিথি থেকে শুরু করে অংশগ্রহণকারীরা। মেলায় আগত খামারিরা তাদের প্রাণী নিয়ে এসে পড়েন চরম বিপদে। নানান অব্যবস্থাপনায় করেন ক্ষোভ প্রকাশ। এছাড়া মেলার উদ্বোধনী ও পুরুষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আলোচনায় প্রাণীসম্পদ অফিসারের বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতা ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেন খোদ আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।
প্রদর্শনীতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন এর বিরুদ্ধে দায়সারাভাবে প্রদর্শনীর আয়োজন ও সেরা খামারিদের পুরুষ্কার বাবদ স্বাক্ষর বিহীন ফাঁকা চেক প্রদানসহ নানান অভিযোগ তুলেন মেলায় অংশগ্রহণ করা খামারি , প্রদর্শনীতে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীসহ উপজেলায় কর্মরত একাধিক গণমাধ্যমকর্মীরা।
সকাল ১১ টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পরপরই ২ ঘন্টার মধ্যেই মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করার অভিযোগ উঠেছে। অথচ আমন্ত্রণ কার্ডে সকাল ৯ঃ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৩ ঘটিকা পর্যন্ত সময় উল্লেখ করা হয়েছিল ।
অফিস সূত্রে প্রদর্শনী মেলা সম্পর্কে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রদর্শনীর জন্য বিভিন্ন খ্যাতে ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।
সরেজমিনে লক্ষ্য করা যায় গুটিকয়েক খামারিকে নিয়ে উপজেলা পরিষদ মাঠ প্রাঙ্গণে নামমাত্র এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ছিলনা উল্লেখযোগ্য এবং দৃষ্টি আকর্ষণীয় কোন প্রাণী। অনুষ্ঠানটির ব্যাপক প্রচারের জন্য ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও দর্শনার্থীদের অনেকেই বলেন প্রচারের জন্য কোন মাইকিংই শুনতে পায়নি তারা। প্রদর্শনী উপলক্ষে ছিল না কোন প্রচার প্রচারণা যার ফলে মেলায় কাঙ্ক্ষিত দর্শকের দেখা মেলেনি। প্রদর্শনী স্থলে ৫০টি স্টল বাবদ বরাদ্দ ছিল ৬৯ হাজার ৫০০ টাকা কিন্তু প্রদর্শনীতে ৪৪টি ব্যানার টাঙানো থাকলেও ছিলনা ৪৪টি পৃথক পৃথক স্টল। আবার সেই স্টলে স্বল্প সংখ্যক খামারিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। যার মধ্যে অধিক সংখ্যায় ছিল বিভিন্ন ভেটেরিনারি ঔষধ কোম্পানির প্রদর্শনী।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রকৃত খামারিদের সাথে কথা বলে জানাযায় অধিকাংশ খামারি এ বিষয়ে কিছুই জানেনা। প্রদর্শনীতে নমুনা ৪৪টি স্টলে পশুর পরিবর্তে কোন কোন স্টলে ঘাস ও খরের বস্তা দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু স্টল ফাকা রাখা হয়েছিল।
অতিথিদের নামে সম্মানী বরাদ্দ থাকলেও প্রদর্শনী শেষে তাদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায় তারা কোন সম্মানী পায়নি। এছাড়া স্টলে স্থানীয় খামারিদের বাদ দিয়ে কর্মকর্তার নিজ দপ্তরের কর্মচারী ও কাছের অতিপরিচিত লোকদের নিয়ে এসে হাতে কোন একটি পশু ধরিয়ে দিয়ে স্টলে দাঁড়িয়ে রাখা হয়েছিল।
প্রদর্শনীর ৫০টি স্টলের পশুর জন্য ২২০ টাকা হারে খাবারের পাত্র বাবদ বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার টাকা কিন্তু খাবারপাত্র দেখাযায় মাত্র ১৫ টিতে যার গায়ে মূল্য দেয়া ছিল সর্বোচ্চ ১’শ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। পশুর খাবার বাবদ বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার টাকা। মেলায় পশু নিয়ে আসা খামারিরা অভিযোগ তুলেন তাদের ডেকে এনে ১০ টাকার কিছু ঘাস ও ১ কেজি করে ভুষি ও যতসামান্য অন্যান্ন পশু খাদ্য স্টলপ্রতি বরাদ্দ দেয়া হয় যা যথেষ্ট ছিলনা। মেলায় নিয়ে আসা পশু- পাখির চিকিৎসা বাবদ ৫ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও খামারিদের সাথে কথা বলে জানাযায় লক্ষিটারী ইউনিয়নের ৫ কিলোমিটার দূর থেকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা এক খামারির গরু অসুস্থ হলেও কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সব বিষয়েই ছিলো প্রাণিসম্পদ অফিসারের জোড়াতালি হিসেব।
দুপুরের খাবার বাবদ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও স্থানীয় একটি হোটেল থেকে ২০০ প্যাকেট বিরিয়ানি (প্যাকেট প্রতি ১২০ টাকা ব্যায়) ও আমন্ত্রিত ৪০ জন অতিথির জন্য আলাদাভাবে সবজি, মাছ, মাংসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানেও গাফিলতি পাওয়া যায়। পানির বোতল স্বল্পতাসহ ছিল নিম্ন মানের খাবার। এমনকি অনুষ্ঠানস্থলে আসা অনেকেই খাবার না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে।
উপজেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেনের যোগদানের পর থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। তার দপ্তরের প্রতিটি সরকারি অনুষ্ঠানে নানান অনিয়ম দেখা যায় এমনকি সেগুলো নিয়ে বহুবার পত্র পত্রিকা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ তুলে বলেন, প্রায়দিন অফিসে বিলম্বে আসা এমনকি অফিস ফাঁকি দেয়ারও ঘটনা শুনাযায় তার বিরুদ্ধে।
রংপুর জেলা যুবলীগের প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান লিটন তিরস্কারের সুরে বলেন, গঙ্গাচড়া উপজেলার প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন সবসময় পত্রিকার হেডলাইন হতে পছন্দ করেন। শুনেছি তিনি জামাতপন্থী তার কারণে আমাদের সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাকে এ উপজেলা থেকে বিদায় করা উচিত।
ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, গতবছর জেন্ডার সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণ বিষয়ক খামারিদের প্রশিক্ষণে খামারিদের খাবারের বরাদ্দের টাকা আত্মসাধ, ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রাণীসম্পদ সেবা প্রদর্শনী মেলার টাকা আত্মসাদ, চরাঞ্চলে পিছিয়ে পড়াদের মাঝে ছাগল-ভেড়া প্রদানে অনিয়ম। আর কত খবর তার পত্রিকায় দেখবো। শুনেছি তিনি উপজেলা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে চলেন কাউকে কেয়ার করেন না। তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করার ক্ষমতা আছে তাই বারবার খবর হয়েও চেয়ার ধরে আছেন বহাল তবিয়তে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেনের সাথে এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর না দিয়ে বরং দাবী করে বলেন, গোটা রংপুর বিভাগে তার চেয়ে ভালো আয়োজন কেউ করে থাকলে তিনি অভিযোগ মেনে নিবেন। তিনি আরও বলেন, এই উপজেলার বেশ কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী তার ঘনিষ্ঠবন্ধু তারা ভালো খবরটাই প্রকাশ করে দিবেন। কোন পত্রিকার খারাপ খবরকে তোয়াক্কা করিনা। কে কি খবর করলো তা দেখার সময় নেই।
প্রদর্শনী উদযাপন কমিটির সভাপতি ও গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাহিদ তামান্না আয়োজনে কমতি ছিল স্বীকার করে বলেন, পুরুষ্কার প্রাপ্ত সেরা খামারিদের স্বাক্ষরবিহীন ফাঁকা চেক প্রদান আমার কাছে মনে হয়েছে একটি বড়ধরনের অনিয়ম। এই কাজটি অবশ্যই সবার দৃষ্টিতে সন্দেহমূলক। তিনি আয়োজনটি আরো সুন্দর করে করতে পারতেন তিনি বরাবরই দাপ্তরিক কাজে উপজেলা প্রশাসনের কারও সাথে সমন্বয় করেন না। প্রদর্শনী মেলা আয়োজন উপলক্ষে তাকে গতবার সমন্বয় করতে বলেছিলাম তিনি আমাকে কিছু না জানিয়ে সেবার নিজের ইচ্ছেমত করেছিলেন এবারো একই পন্থা অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। আমি ওনার বিষয়ে এর আগেও বেশ কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। প্রাণিসম্পদ প্রদর্শনীর বরাদ্দের কথা আমাকে জানিয়েছেন কিন্তু কোন খাতে কত টাকা ব্যায় করেছেন তা এখনও উপস্থাপন করেননি। প্রকল্পের সভাপতি হিসেবে সামনে জেলা সমন্বয় মিটিংএ প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তার এসব অনিয়ম তুলে ধরে ঊর্ধ্বতন স্যারদের সাথে কথা বলবেন বলে গণমাধ্যম কর্মীদের আশ্বাস প্রদান করেন।




















