আশিক বিল্লাহ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আজকাল তরুণরা প্রতিনিয়ত লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হচ্ছে। “ঘরে বসে আয় করুন লাখ লাখ টাকা”—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারিত হচ্ছে অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও পোর্টাল। অনলাইন জুয়া সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ফুটপাতের চা দোকানি, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ সকল শ্রেণির মানুষকে আছড়ে ফেলছে। তরুণরা জানাচ্ছেন, অনলাইন জুয়া এক ধরনের নেশা, যা থেকে বের হওয়া কঠিন। তবে এটি কেবল নেশা নয়; আইনগত একটি অপরাধ।
আইনি রূপরেখা:.সদ্য জারি হওয়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর ২০ ধারা অনুযায়ী—.যদি কেউ অনলাইনে জুয়া খেলার উদ্দেশ্যে কোনো ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা ডিভাইস তৈরি বা পরিচালনা করে অথবা জুয়া খেলায় অংশগ্রহণ, সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান করে, অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞাপন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালায়, তবে এটি আইন অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ফোনে জুয়ার অ্যাপস রাখা নিজে খেলার উদ্দেশ্য ছাড়াও আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী, অ্যাপস ব্যবহার করে খেলায় অংশগ্রহণ বা প্রচারণা চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই কোনো জুয়ার অ্যাপ ফোনে রাখা আইনগত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।
একই অধ্যাদেশের ধারা ২১-এ বলা হয়েছে—যদি কোনো ব্যক্তি সাইবার স্পেস ব্যবহার করে জালিয়াতি করে, তবে উক্ত ব্যক্তির কার্য হবে একটি অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এখানে সাইবার স্পেসে জালিয়াতি বলতে বোঝানো হয়েছে—মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মানি ব্যবহার করে জুয়ার অর্থ লেনদেন করা, হুন্ডি বা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে জুয়ার অর্থ পরিচালনা করা অথবা অন্যান্য ডিজিটাল ফাইল, ডেটা বা নেটওয়ার্ককে জুয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা।
এছাড়া ধারা ২২-এ বলা হয়েছে—সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা করা একটি অপরাধ। এ অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
প্রতারণা বলতে বোঝানো হয়েছে—অনুমতি ছাড়া কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস বা নেটওয়ার্কে তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা বিকৃতি ঘটানো, নতুন বা ভুল তথ্য তৈরি করে অর্থনৈতিক বা অন্য সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করা,অনলাইনে জুয়ার ক্ষেত্রে ছলনার মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণ বা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
সামাজিক প্রভাব: অনলাইন জুয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপের মাধ্যমে বাজি ধরার সুযোগ থাকায় বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম সহজেই এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। অনলাইনে ক্ষতি হওয়া অর্থের কারণে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তরুণরা জুয়ার নেশায় শিক্ষা ও কর্মজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকে জুয়ার কারণে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছে, আবার মানসিক চাপ ও হতাশার কারণে দেশে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ স্পষ্টভাবে অনলাইন জুয়া, জালিয়াতি ও প্রতারণাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই শুধু নাগরিক সচেতনতা নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় নজরদারি ও সজাগতাও অপরিহার্য। পুলিশ, ডিবি, সিআইডি, র্যাবসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এসব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে তরুণদেরকে অনৈতিকতার প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে।
শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধিই হবে অনলাইন জুয়া বন্ধের মূল অস্ত্র।
লেখক আশিক বিল্লাহ: শিক্ষার্থী, আইন ও মানবাধিকার বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক




















