বাংলাদেশ সকাল
শুক্রবার , ১৮ আগস্ট ২০২৩ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. এক্সক্লুসিভ
  7. কৃষি বার্তা
  8. ক্যাম্পাস
  9. খেলাধুলা
  10. খোলা কলাম
  11. জাতীয়
  12. তথ্য ও প্রযুক্তি
  13. ধর্ম ও জীবন বিধান
  14. নির্বাচন
  15. প্রবাস

তত্ত্বাবধায়ক সরকার: নির্বাচনী ব্যবস্থার “একিলিস হিল”  (চতুর্থ কিস্তি)

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেস্ক
আগস্ট ১৮, ২০২৩ ১০:৪৮ অপরাহ্ণ

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিয়ার রায়:

বিচারপতি খায়রুল হক: ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সবচেয়ে দীর্ঘ মতামত দিয়েছেন। তাঁর জাজমেন্ট পড়ার অসুবিধা হলো তিনি বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যান বলে পাঠকের মনোসংযোগে চিড় ধরে। তাঁর জাজমেন্টটি অসংখ্য ছোট বড় অনুচ্ছেদে সাজানো। এর মধ্যে এক বাক্যের অনুচ্ছেদও আছে।

সবার বোধগম্যতার জন্য তিনি রায়টি বাংলায় লিখেছেন। তবে সেটি ইংরেজি বাংলা মিশ্রণ ঘটায় আবেদন হারিয়েছে। একই কথার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় খামাখা এর দৈর্ঘ্য বেড়েছে। অনেক সময় অনুচ্ছেদান্তরে যেতে বক্তব্যের ছন্দপতন ঘটেছে। তবে কাঁটা বেঁছে পড়তে পারলে রায়টি অনেকের কাছেই ‘ভোলুমিনাস’ থেকে ‘লুমিনাস’ মনে হতে পারে।

বাংলায় এবং বড় কলেবরে জাজমেন্ট লেখা নিয়ে বিচারপতি ইমান আলী বিচারপতি খায়রুল হককে আলতো করে খোঁচা দিয়েছেন। বিচারপতি আলী বিচারপতি খায়রুল হকের রায়কে “ম্যাগনাম অপুস”, বিশ্ব সংসার থেকে তন্নতন্ন করে খুঁজে আনা “কপিয়াস রেফারেন্স” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এমনকি বাংলা জাজমেন্টও বিচারপতি হকের গ্রামের মানুষ বা শহরের মানুষ পড়বে কিনা, পড়লেও বুঝবে কিনা তা নিয়ে বিচারপতি আলী সংশয় প্রকাশ করেছেন।

প্রথমত এই কথাটি বিচারপতি আলী না লিখলেও পারতেন;

দ্বিতীয়ত, নিয়তির পরিহাস! আসলেই বিচারপতি হকের জাজমেন্ট খুব বেশি মানুষ পড়েন বা পড়েছেন বলে মনে হয়না। বিশেষ করে, আমাদের গণমাধ্যম ঘুরেফিরে হাতেগোনা কয়েকজন “সংবিধান বিশেষজ্ঞর” নির্মিতি থেকে বের হতে পারেনা। তাঁদের মতামত দ্বারা পুরো সমাজ যত্নকরে বিভ্রান্ত হয়।

[Note– J Imman Ali’s words: “With respect, I would say that the judgment is a magnum opus which deals with the matters arising in this case in extreme detail by copious reference to numerous judgments and treatise from various parts of the world, which have been rendered most eruditely in the mother tongue, although, again with respect, I cannot agree that the Bangla erudition will reach the masses in the far-flung corners of the country, and whether every man sitting in his village hut or even town house will be able to read and understand the contents thereof.]

বিচারপতি খায়রুল হক প্রজাতন্ত্র, রাষ্ট্রের জনগণতান্ত্রিক চরিত্র, জনগণের প্রতিনিধিত্ব, সংসদের জবাবদিহিতা, বিচারিক যাচাই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মর্যাদা, এবঙ বিচারকের মন ইত্যাদি প্রশ্নে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তাভারানত থেকেছেন সারা রায় জুড়ে।

এই সকল ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট আবেগিক, প্রাণঘণ, তাত্ত্বিক মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এবং পৃথিবীর তাবৎ জুডিশিয়াল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের লিটারেচার থেকে ধার করে দারুন কিছু জুরিসপ্রুডেন্সিয়াল দ্যোতনা সৃষ্টি করেছেন। আমার ভাষা ও মুল্যায়নযোগে তাঁর রায় থেকে কিছু যুক্তি, কথা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি:

১. বিচারপতি খায়রুল হক নিরপেক্ষ আইন পরামর্শকদের (amicus curae) কাছ থেকে দু’টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর পাননি। ২০০৫ সালের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির রায়েও এগুলোর উত্তর মেলেনা।

প্রথম প্রশ্নটি আমার মতো করে লিখছি। কথাটা এইরকম, বুঝলাম যে, কেয়ারটেকার সরকার গণতন্ত্রের শ্রীবৃদ্ধি করে, তাহলে, সংবিধানের ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদ একত্র করে রাষ্ট্রের যে জনগণতান্ত্রিক চরিত্র ধরা পড়ে, তত্ত্বাবধায়কের আমলের তিন মাসে সেই চরিত্রের সাংবিধানিক মান কি হবে?

দ্বিতীয় প্রশ্নটি হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কয়টা মেয়াদের জন্য হবে? এর উত্তরে শুধু বিচারপতি টিএইচ খান ক্যাজুয়ালি উপস্থিত উত্তর দিয়েছিলেন পঞ্চাশ বছর। ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখায় সম্ভবত তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে করার বোঝাপড়া ছিল। স্মর্তব্য, একটা গ্রাম্য প্রবাদ আছে, ‘যার হয়না ছয়ে তার হয়না ষাটে।’ আমাদের কবে হবে কে জানে?

বিচারপতি খায়রুল হ্যামলেট রূপক টেনেছেন। তিনি লিখছেন: গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠন করা হলো “প্রিন্স অব হ্যামলেটকে বর্জন করিয়া হ্যামলেট নাটক মঞ্চস্থ করার মতো”। যথার্থভাবেই, গণতন্ত্রে প্রকৃত নায়ক জনগণ।

২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হন। প্রতিরক্ষা প্রধান, অধ্যাদেশ ও জরুরি অবস্থা জারি, মৌলিক অধিকার স্থগিতকরণ ইত্যাদি ক্ষমতা অনুশীলনে তখন তিনি একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। যেটা প্রচলিত পুরো সাংবিধানিক কাঠামোকে তছনছ করে দ্যায়। যে ক্ষমতা এমনকি ১৯৭২-এর আদি সংবিধানও রাষ্ট্রপতিকে দেয় নাই, তাই-ই ১৩তম সংশোধনী রাষ্ট্রপতিকে দিয়েছে।

৩. জনগণের সার্বভৌমত্ব দানের সামগ্রী নয়, যখন খুশি দিলাম, যখন খুশি নিয়ে নিলাম। ভারত ১০৫ বার আর আমেরিকা ২৭ বার সংবিধানে সংশোধনী এনেছে। কিন্তু একবারও তারা জনগণের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেয় নাই।

৪. আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জুডিশিয়াল রিভিউ, মৌলিক কাঠামো– এগুলোতে কোনো সংশোধনী আঘাত হানলে গার্ডিয়ান হিসেবে কোর্ট সেই সংশোধনীকে আদালত বেআইনি ঘোষণা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সে আঘাত হেনেছে।

[কবি জসীম উদদীনের একটি গানের কথা মনে এলো: “হো তুই যারে আঘাত হানলিরে মনে, সে জনকি তোর পর!]।

৫. সরকার সংসদের কাছে জবাবদিহি করবেন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার কার কাছে জবাবদিহি করবেন? সংবিধানের ৫৫ (২) অনুচ্ছেদ বলছে যে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক/তাঁহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান মতে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রযুক্ত হবে। আবার একই সংযোগে ৫৫(৩) এ বলা আছে যে, মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী। সংসদের নিকট এই দায়বদ্ধতা জনগণের ক্ষমতার অভিব্যক্তি।

তাহলে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টারা ওই তিনমাস কার কাছে দায়ী? শুধু “মুটাডিস্-মুটেন্ডিস” (আগের ক্ষেত্রে যেমন, এই ক্ষেত্রেও তেমন) প্রয়োগ হবে এরকম বলে দিলেই কথাটা ক্লিয়ার হয়না। সংবিধান কোনো পুলিশ ম্যানুয়াল তো নয়। বিচারপতি খায়রুলের মতে “উপদেষ্টা নমস্য ব্যক্তি, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর পার্থক্য আকাশসম।”

৭. ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ কোনো নির্বাচনই হেরে যাওয়া দল মেনে নেয়নি। যতদিন গেছে অবস্থার তত অবনতি হয়েছে।

২০ মে ১৯৯৬ রাজপথে ট্যাংক দেখা গেছে, ২০০১-এ বিচারপতি লতিফুর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ত্রিশ মিনিটেই ১০ জন সচিবকে দায়িত্বে আসার আগের করা “হোম ওয়ার্কে” ওএসডি করা হয়েছে। চতুর্দশ সংশোধনী করে বিচারপতিদের অবসরের মেয়াদ বাড়ানো হয়, যাতে করে বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক প্রধান হতে পারেন। আর ২০০৬-এ নানান সংকট তৈরি করে ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা বনে যান এবং হাওয়া ভবনের কথায় চলতে থাকেন।

দুর্বল চিত্তের নতজানু লোক রাষ্ট্রের বিপদ ডেকে আনতে পারেন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন —এর জ্বলন্ত প্রমাণ। রাষ্ট্রের যে ক্ষতি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ করে গেছেন তা কাটিয়ে উঠতে বহু সময় লাগবে।

৮. এই কনটেক্সটে বিচারপতি খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন। তবে যেহেতু এই ব্যবস্থার অধীনে ৩ টি নির্বাচন (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮) অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেগুলো বৈধ থাকবে। অবৈধতা ভবিষ্যৎ থেকে কার্যকরী হবে (ধরে নিন আপনি রিট দাখিলের সময় ১৯৯৯-এ দাঁড়িয়ে আছেন)। অর্থ্যাৎ এটি আপিল বিভাগের রায় হবার তারিখ থেকে অবৈধ (১০ মে ২০১১ থেকে)। ইংরেজিতে এই মতবাদের নাম ডকট্রিন অব প্রস্পেক্টিভ ওভাররুলিং (ভবিষ্য সাপেক্ষ বাতিল)।

৯. ভবিষ্য সাপেক্ষ বাতিলের পরও বিচারপতি খায়রুল হক অনেকটা যেচে বলেছেন যে, ২০১১-এর পরও দুটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে হতে পারে (পড়ুন হতে পারতো)। এইখানে অনেকের মতে রায়টির হঠাৎ ছন্দ পতন ঘটেছে। দুটি নির্বাচন অবশ্য হওয়ার পরামর্শ দিতে তিনি কতকগুলো ল্যাটিন প্রবাদের সাহায্য নিয়েছেন। যা একবাক্যে শেষ হয়েছে। মনে হয়েছে যে, “উত্তাল তরঙ্গের মাঝে তরণীখানা ‘ফুছুৎ’ করে ডুবে গেলো!

যাহোক, আরো দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজন করলে সেটা কোন গ্রাউন্ডে হবে তা তিনি বলে দিয়েছেন। তাঁর দেখানো কারণগুলো হলো: প্রয়োজন, নিরাপত্তা, এমিকাস কিউরিদের প্রজ্ঞাকে সম্মান জানানো এবং সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার।

কিন্তু সেটা জানিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। তিনি ন্যায্য ও অন্যায্য কারণে রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। আরো দুইটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক-এর অধীনে হওয়ার কথা বলতে গিয়ে অবশ্য তিনি দু’টি শর্ত বেঁধে দিয়েছিলেন:

১) পার্লামেন্টকেই এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; এবং

২) সর্বশেষ বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রাখা যাবেনা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আরো একটি সম্ভাব্য তত্ত্বাবধায়ক নির্বাচনের ভবিষ্য প্রধান হিসেবে তিনি নিজেকে নিজেই সরিয়ে নিয়েছিলেন। কেননা, ২০১৪ এর নির্বাচনে তিনিই হতেন সর্বশেষ অবসর নেয়া প্রধান বিচারপতি। বিএনপি কি তাঁকে মানতো?

১০. বিচারপতি হক স্বীকার করেছেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বচনের বিধানও সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো। তবে সুন্দর নির্বাচনের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পরিবর্তে একনায়কতন্ত্র আনা যাবেনা। অন্যথায়, তাঁর মতে “ইহা হইবে সাংবিধানিক হারাকিরি” (প্যারা ৯৯৯)।

খায়রুল হক সম্পর্কে কয়েকটি মিথ: ১. সংখ্যাগরিষ্ঠ এমিকাস কিউরির মতামতকে তিনি উপেক্ষা করেছেন:

এমিকাস কিউরিগণ পক্ষ বা বিপক্ষের উকিল নন, তাঁরা আদালতকে আলোকিত করেন। তাঁদের মতামত আদালতের উপর বাধ্যকরী নয়। তাছাড়া আমি উপরে (তৃতীয় কিস্তিতে) দেখিয়েছি যে, এক দুজন বাদে বাকি এমিকাস কিউরিরা আদালতে যে সাবমিশন রেখেছেন, সেসব থেকে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়না। বিচারপতি হক প্রায় সব মতামতকে বিবেচনায় নিয়ে রায় দিয়েছেন।

আদালতের সামনে বিচার্য ছিল যে, ত্রয়োদশ সংশোধনী যেরূপে আছে, সেরূপে সংবিধানসম্মত কিনা। সকলের মতামতের ভিত্তিতেই তিনি বলেছেন যে, সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধান রেখে করা সংশোধনীটি অসাংবিধানিক। সেটাই সঙ্গত।

২. তিনি সংক্ষিপ্ত আদেশ থেকে মূল আদেশে গিয়ে ভিন্ন কথা বলেছেন:

মৌলিক পরিবর্তন না হলে, সারসংক্ষেপ আদেশের থেকে পূর্ণাঙ্গ রায়ে কিছু পরবিবর্তন আসা স্বাভাবিক। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে মূলত সাব্যস্ত (ratio decidendi) হয়েছে যে, উক্ত সংশোধনীটি বেআইনি। চূড়ান্ত রায়েও ওই একই কথা আছে। রায়ের আগেই পার্লামেন্ট এই ব্যবস্থা বাতিল করায়, তাঁর চূড়ান্ত রায়ে আরো দুটি নির্বাচন হওয়ার প্রশ্নে ভাষিক দৃঢ়তার অভাব ঘটেছে (obiter dicta)।

৩. অবসরের পরে তিনি রায় লিখে অন্যায় করেছেন:

অবসর নেবার পর বিদায়ী বিচারপতির হাতে যে সকল নিস্পত্তি হয়ে যাওয়া মামলার রায় পাওনা থাকে তা তিনি অবসর নেবার যথাসম্ভব কম সময়ের মধ্যে লিখে জমা দিয়ে দেন। এটা রেওয়াজ। এ নিয়ে ধরাবাঁধা কোনো সময় নেই। ঠিক যে, অবসরের পর বিচারক শপথ দ্বারা তাড়িত থাকেননা। আমার ধারণা, এটি আপেক্ষিক প্রশ্ন।

বিচারক যাতে করে পক্ষপাতদুষ্ট না হন, সেজন্য উচিত হলো খুব কম সময়ের মধ্যে রায় দিয়ে দেয়া। যাতে সন্দেহ মুক্ত থাকা যায়। ত্রয়োদশ মামলা নিস্পত্তি হবার প্রায় ১৬ মাস পর আপিল বিভাগ রায় দিয়েছেন (বিচারপতি হক একা নন)। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পার্লামেন্ট বাতিল করে দেয়। সম্ভবত এই কারণে তিনি দ্রুত রায় লেখার তাগিদ হারিয়ে ফেলেন।

দেরিতে লিখে তিনি অন্যায় করেননি, তবে পাঁচ/ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় লিখলে তিনি হয়তো এতো সমালোচিত হতেন না।

৪. তিনি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট রায় দিয়েছেন:

সংবিধানকে রাজনীতির বাইরে ভাবা ঠিক নয়। সংবিধান হচ্ছে পরিশীলিত রাজনৈতিক লেটমোটিফ। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটি তো অধিকতর রাজনৈতিক ব্যাপার। সুতরাং, এই ব্যবস্থার পক্ষে বিপক্ষে যে কোনো রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনামুক্ত হবে না।

তবে আমি এই লেখায় আগেই দেখিয়েছি যে, বিচারপতি খায়রুল হক যে সকল যুক্তি দিয়েছেন তা শক্তিশালী, নেহায়েত অগ্রাহ্য করার মতো নয়। ২০০৭ সালেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার রাজনৈতিক সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়, ২০১১-তে এসে এই রায়টি ছিল একটি পরিণতি মাত্র।

আসলে বিচারপতি খায়রুল হকের রায় বিএনপিমনাদের কাছে অনাদৃত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এর প্রধান কারণ হলো, ইতিপূর্বে, পঞ্চম সংশোধনী মামলায় (হাইকোর্ট বিভাগ, ২০০৫) বিচারপতি খায়রুল হক খুব যথার্থভাবেই জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনকে (১৯৭৬-১৯৮১) বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনা। সেখানে তিনি জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা দখল নিয়ে মন্তব্য করেন যে, আগেরকালে বাংলাদেশ বিদেশি বিজেতাদের দখলে শাসিত হলেও স্বাধীন দেশে বাংলাভাষী সামরিক জেনারেলদের দ্বারা বাংলাদেশ দখল হয়ে গেলো।

জেনারেল জিয়া সংবিধানকে সামরিক ফরমানের অধীনস্ত করেন। সেই থেকে ব্যুৎপত্তিগতভাবে “সামরিক আইনকে” আইন ভাবার যে ভ্রান্তি বিলাস বিএনপির মধ্যে রয়েছে, বিচারপতি খায়রুল হক সেই ভ্রান্তি বিলাসে থাপ্পড় মেরেছেন। এজন্য বিএনপি আগে থেকেই তাঁর উপর অন্যায্যভাবে তেতে ছিল।

দ্বিতীয়ত, ড. এম এ সালাম বনাম বাংলাদেশ মামলায় (২০০৯) বিচারপতি হক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বরাত দিয়ে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এখানেও বিএনপিমনা মানুষ যে পুঁজি নিয়ে রাজনীতির বাজারে বিরাজ করেন, সেই পুঁজিতে চপেটাঘাত করেছেন বিচারপতি হক।

সুতরাং, বিএনপি তাঁকে সুযোগ পেলেই বিতর্কিত করবে এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল। বিএনপি রুষ্ট হয়েছে বিধায়ই তত্ত্বাবধায়ক মামলার রায়ে তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাত প্রতিফলিত হয়েছে তা বলার সুযোগ নেই।

বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিয়া (ভিন্নমত): ১. এম এ ওয়াহ্হাব মিয়া আব্রাহাম লিঙ্কনের বিপরীতে উইনস্টন চার্চিলে সওয়ার হয়েছেন। তিনি বলছেন যে, গণতন্ত্র শুধু “বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল” না। এর বেশি কিছু। এরপরে তিনি দারুন একটা কথা বলেছেন:

“ডেমোক্রেসি ইজ প্রবাবলি দ্য মোস্ট ইমোশনালি প্রভোকেটিভ টার্ম ইন দ্য পলিটিকাল ভোকাবুলারি। এটা যেমন সরকারের ধরণ আবার একসাথে বসবাস করার একটি দর্শনও।”

সুতরাং একটা ভালো নির্বাচন করে সবাইকে আমলে নিয়ে চলার মতো ক্ষমতা রাজনৈতিক সিস্টেমের থাকতে হবে। কেয়ারটেকার সরকার হওয়াতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। তিনি চার্চিলের বিখ্যাত “লিটলম্যান” উক্তির উপর ভর করতে চেয়েছেন।

চার্চিল ১৯৪৪ সালে পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে বলেন যে, গণতন্ত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা পাবে পেন্সিল হাতে বুথগামী ছোট্ট লোকটি, যে ব্যালটের উপর একটি চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।

পরিবর্তনের আশায়। কোনো জ্ঞানগর্ভ বিশাল আলোচনা করে এই লিটলম্যানের গুরুত্ব উপেক্ষা করা চলেনা। আসলে গণতন্ত্রের গোড়ায় রয়েছে ভোট দেবার স্বাধীনতা। জাস্টিস এম এ ওয়াহ্হাব মিয়ার এই যুক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এ যুক্তিকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।

তবে একটি কথা। চার্চিল দিয়ে আমাদের সংবিধান হবেনা। চার্চিল মেটাফোর ভুল ও ভ্যাকুয়াস কনটেক্সটে ভ্রান্তিকরভাবে ব্যবহার করা হয়। চার্চিল “হোয়াইট সুপ্রেমাসিস্ট” হিসাবে নিন্দিত। ভারতীয়দের তিনি বিস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সুতরাং আর যাই হোক, তাঁর কাছ থেকে গণতন্ত্র না শিখলেও চলে। আর ভোটটা তত্ত্বাবধায়ক সিস্টেমের মাধ্যমেই কেবল সম্মানিত হয়, সেটা ঠিক নয়। তাহলে চার্চিলের দেশে এই সিস্টেম থাকতো।

দুই. তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্বাচিত– এই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন বিচারপতি এম ওয়াহ্হাব মিয়া। তাঁর মতে, এমনি সাধারণ ক্ষেত্রেও তো নির্বাচনের আগে দিয়ে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর ক্যাবিনেট প্রতিনিধি চরিত্র হারায়। কারণ, ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেমে প্রধানমন্ত্রী তখন রাষ্ট্রপতির অনুরোধে নতুন প্রধানমন্ত্রী না আসা পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যান। তাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারও অপ্রতিনিধিত্বশীল হলেও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করলে ক্ষতি কি? তাছাড়া রাষ্ট্রপতি তো নিৰ্বাচিত স্টেটাস নিয়েই সবার উপরে থাকেন!

বিচারপতি মিয়ার এই যুক্তি মান্য করা কঠিন। প্রথমত কিছুদিন যে কতদিন, আল্লা মালুম।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগ দিয়ে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধিত্ব চরিত্র হারাননা। বরং তিনি নিৰ্বাচিত হওয়ার যে সম্মান সেটি পেতেই থাকেন, এবং তাঁকে বিশ্বাস করতে রাষ্ট্রপতির বা জনগণের অসুবিধা হয়না। তাছাড়া, যুদ্ধ সংকটে বা রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থায় পূর্বের পার্লামেন্টকে রাষ্ট্রপতি অনেকটা সাপের বিন বাজানোর মতো দংশিতকে পুনরুজজীবন করতে পারেন। এতে বুঝা যায় আগের সংসদ আসলে মরে না, সুপ্ত থাকে।

অধিকন্ত, আমাদের সংবিধানের প্রণেতারা সংসদীয় ধারাবাহিকতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন আমেরিকার সিনেট থেকে। সিনেট নেভার ডাইস। প্রতি তিন বছর পরপর এক-তৃতীয়াংশ সিনেটর নিবাচিত হয়ে বিদ্যমান সিনেটরদের সাথে যুক্ত হন। বাংলাদেশের সংসদের এই জীবন্ততার ধারণা একটু আলাদা করে নেয়া হয়েছে আর কি। আমেরিকার টা যদি ভালো হয়, আমাদের টা খারাপ হবে এমনটি ভাবার কি অবকাশ থাকতে পারে?

তিন. পিটিশনারদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছিল, ধরা যাক, তাত্ত্বিকভাবে, রাষ্ট্রপতি এক্সট্রিম সিচুয়েশন দেখিয়ে আগের পার্লামেন্ট রিকল করলেন। তাহলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার/দের উপস্থিতিতে সেই রিকল করা সংসদের এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের স্টেটাস কি হবে? এক্ষেত্রে, বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিয়ার জাজমেন্টে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়না।

তবে তিনি, বলেছেন যে, এ ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট এক্সট্রিম সিচুয়েশনে রিভাইভড হয়, সেটা কোনোদিন নাও ঘটতে পারে। তবে বলা যায়, কল্পনার সব সিচুয়েশনে কি হবে, একটি সংবিধানকে তাঁর জবাব দিতে পারতে হয়। আর কপাল খারাপ হলে, এক্সট্রিম সিচুয়েশন বার বার এসে হাজির হয়।

চার. অন্য দেশের নির্বাচন মডেল আমাদের গ্রহণ করা সাজেনা। এটি সত্যি কথা। নিজস্বতা থাকতেই হয়।

কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলে না। আমাদের সংবিধানটা কমন ল মডেলের। সুতরাং কমন ল মডেলে যে সিস্টেম সময়োত্তীর্ণ তা গ্রহণ করতে পারাটা একটি জাতিগত সক্ষমতা। এটি একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাপার। সেটি তৈরিতে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দায় রয়েছে। গ্লোবাল কনস্টিটিউশনালিজম-এ বাইরের পরিবর্তন যেমন খেয়াল রাখতে হয়, আবার উপযুক্ত ক্ষেত্রে নিজস্ব সংবিধানের স্বাজাত্য তুলে ধরতে হয়।

বিচারপতি মিয়া অবশ্য মনে করেন, যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাংলাদেশের জনগণ তিনবার আমল করেছে, তাই প্রতিষ্ঠিত এ নিয়মটি আর অসাংবিধানিক বলার সুযোগ নেই। একটি সিস্টেমের কেবল অপব্যবহার হয়েছে বলেই সেটাকে বেআইনি বলা যায়না।

যুক্তিটি খারাপ না। তিনবার মেনে নেবার বিপরীতে বিচারপতি খায়রুল হকের যুক্তিটি উপরে দেখে নিতে পারেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে দিন গেছে আর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিতর্কিত হয়েছে।

আর কোনো আইন যদি অপব্যবহারের পথ যত্ন নিয়ে খুলে দ্যায়, তাহলে সেটি মূল বা শেকড়ে গিয়ে আঘাত হানে, এবং সেটিকে শুরু থেকেই বেআইনি করে ফ্যালে। একই যুক্তিতেই কিন্তু অনেকেই বর্তমানের ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে অসাংবিধানিক বলে যান।

পাঁচ. বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিয়া আর একটি যুক্তি দিয়েছেন যে, একটি সম্মানিত ইলেকশনে সম্মানিত থাকা যায়। এটি একটি অকাট্য যুক্তি। এ নিয়ে বোধ হয়, কারো কোনো দ্বিমত নেই।

এ ব্যাপারে মেজরিটি জাজদেরও কোনো দ্বিমত নেই। ভালো নির্বাচন চর্চা করতে হয়। সামরিক শাসন আর সাংবিধানিক ক্যু দিয়ে একটি দেশকে ১৬ বছর পঙ্গু করে রাখলে সেই চর্চা গোড়ায় বাধাপ্রাপ্ত হয়।

ছয়. বিচারপতি এম এ ওয়াহ্হাব মিয়া মনে করেছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সিস্টেম বিচার বিভাগের জন্য “ঝুলন্ত মূলা” না। কোনো প্রধান বিচারপতি উপদেষ্টা হবার জন্যে প্রলুব্ধ হয়েছেন এমনটি হয়নি বলে তাঁর মত। বলাই বাহুল্য, এটি একটি বাস্তবতা বিবর্জিত কথা। তাহলে তিনি মূল বিচার্য বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় (কেয়ারটেকার-এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এই মৌলিক কাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা) ধরতেই পারেননি। কি জন্য সবাই আদালতে গেলো, আর চারিদিকে এতো উদ্বেগই বা কেন দেখা দিলো?

বিচারপতিদের স্বাধীনতার প্রশ্ন, কোনো বিচারক নিজে কোনোভাবে প্রলুন্ধ হয়েছেন কিনা শুধু সেই ব্যাপার নয়, বরং অন্য কেউ তাঁকে/তাঁদেরকে প্রলুব্ধ করতে পারে, এমন যুক্তিসঙ্গত আশংকা আছে কিনা–সেই প্রশ্নও বটে। আশংকা যদি থাকে, তবে তাইই বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় আঘাত হানতে যথেষ্ট।

আমি বিচারপতি সিনহা ও বিচারপতি এম ইমান আলীর রায় নিয়ে আলোচনা করবোনা। কেননা, সেখানে আমি ইম্প্রেসিভ কিছু পাইনি।

দু’টি রায় তুলনা করলে বিচারপতি খায়রুল হকের রায় শ্রেয়তর যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। তাহলে, দেখা গেলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আমাদের সাংবিধানিক যে অভিজ্ঞান, সেই অভিজ্ঞানের ভেতর নেই।

আপিল বিভাগ খুব যথার্থভাবেই ২০১১ সালে এই সিস্টেমকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

 

পঞ্চম ও শেষ পর্ব: ত্যাশে? 

আমাদের আঞ্চলিক বাংলায় একটি শব্দ বলে–ত্যাশে? এর মানে হলো তারপর? তারপর কি হলো, সে গল্প বলবো পরের পর্বে। চুড়ান্ত রায় লেখার আগেই পার্লামেন্ট কেন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করলো, সেই বাতিল প্রক্রিয়ায় সরকার, নাগরিক সমাজ, ও বিএনপির কন্ট্রিবিউশন কি তা নিয়ে সেখানে আলোচনা করবো ….. [আগামী কিস্তিতে সমাপ্য]

লেখকঃ অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ - এক্সক্লুসিভ